একজন পুলিশ কর্মকর্তার না বলা কথা 

সবুজ জমিন: আমার নানা আলহাজ্ব মাওলানা মোঃ সুলতান উদ্দিন আহমেদ যিনি সুলতান মৌলভী হিসাবে সমধিক প্রসিদ্ধ ছিলেন ১৮৮৫ সালের দিকে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৫৭ সালে মৃত্যুবরণ করেন। ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষে জন্মগ্রহণকারী জনাব আলহাজ্ব মাওলানা মোঃ সুলতান উদ্দিন আহমেদ দিল্লির দেওবন্দ মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেছিলেন। তিনি মুসলিম বাংলা ভাষাভাষীদের নিকট একজন প্রথিতযশা আলেম হিসাবে সুপরিচিত ছিলেন। তিনি কুষ্টিয়া, রাজশাহী, বগুড়া এবং মুর্শিদাবাদ জেলার বাংলা ভাষাভাষী মুসলিম সম্প্রদায়ের নিকট একজন ইসলামী বিষয়ে পান্ডিত্য অর্জনকারী সুবক্তা হিসাবে পরিচিত ছিলেন। এহেনও একজন মাওলানার নাতি হিসাবে বাংলাদেশের আলেম সমাজের প্রতি আমার সবিশেষ শ্রদ্ধাবোধ রয়েছে। বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলাম ও হেফাজতে ইসলামের নেতৃত্বদানকারী ও সমর্থনকারী কিছু সংখ্যক উলামায়ে কেরামগণের ইসলামের প্রকৃত পথ হতে বিচ্যুত হয়ে ইসলাম কে ক্ষমতা দখলের হাতিয়ার হিসাবে একটি জঙ্গি ভাবাপন্ন ধর্মে কালিমালিপ্ত করার প্রচেষ্টা যেমন নিন্দনীয় তদ্রুপ তাদের এহেন বিতর্কিত কার্যক্রম আমদের ন্যায় বর্তমান প্রজন্মকে ভুল পথে পরিচালিত করে। হেফাজতে ইসলামের বর্তমানের বহুল আলোচিত মাওলানা মামুনুল হকের নারী কেলেঙ্কারির বিষয়টি নিঃসন্দেহে কলঙ্কিত এবং আলেম উলামায়ে কেরামগণের জন্য মর্যাদা হানিকর। আলেম সমাজের জন্য এই ঘটনাটি নিঃসন্দেহে লজ্জাজনক। মাওলানা মামুনুল হকদের মত ভ্রষ্ট চরিত্রের আলেমদের কারনে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের নিকট অতি সম্মানিত আলেম উলামাদের প্রতি জনগনের বিশ্বাসের জায়গাটিতে আস্থাহীনতা তৈরি হয়।

২০০৫ সালের দিকের একটি ঘটনা মুফতি মাওলানা ফজলুল হক আমিনীর দলের একজন আলোচিত মাওলানা খতমে নবুয়ত মুভমেন্ট নামক একটি সংস্থার চট্টগ্রাম বিভাগের আহ্বায়ক ছিলেন। ২৭ বছর বয়সি অনলবর্ষী এই বক্তা জঙ্গি স্টাইলে বক্তব্য রেখে কওমি মাদ্রাসায় পড়ুয়া ছাত্রদের উস্কানির ক্ষেত্রে পারঙ্গমতা অর্জন করেছিলেন। উক্ত মাওলানার নেতৃত্বে কওমি মাদ্রাসার ছাত্র ও মাওলানাগন একদা চট্টগ্রাম মহানগরীর পাঁচলাইশ এলাকায় অবস্থিত কাদিয়ানী সম্প্রদায়কে অমুসলিম ঘোষণার দাবিতে জোর আন্দোলন গড়ে তোলে। তাদের এই আন্দোলনের খেসারত হিসাবে তৎকালীন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার(নর্থ) জনাব মিয়া লুৎফর রহমান চৌধুরিকে আকষ্মিকভাবে বদলী হতে হয়েছিল।

যাই হোক ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসের দিকে কোতয়ালী থানাধীন গোলপাহাড় এলাকায় যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্বীকৃত যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরির বাড়ির সন্নিকট হতে তার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। তাৎক্ষনিকভাবে তার মৃতদেহ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে পোষ্টমোর্টেম করানো হয়। পোষ্টমোর্টেম রির্পোটে ঘটনাটি হত্যাকান্ড হিসাবে বিবেচিত হয়। উক্ত ঘটনায় খুনের মামলা রুজু হয়। উক্ত মামলার একজন তদারককারী কর্মকর্তা হিসাবে আমি মামলাটি নিবিড়ভাবে তদারকি করেছিলাম। উল্লেখ্য যে, উক্ত সময়ে উপ-পুলিশ কমিশনার(নর্থ) হিসাবে দায়িত্ব পালন করছিলেন জনাব এস এম রুহুল আমিন বর্তমানে তিনি অতিরিক্ত আইজিপি হিসাবে পুলিশ সদরদপ্তরে কর্মরত। উক্ত ঘটনায় স্থানীয় সাংবাদিকসহ চট্টগ্রাম শহরের সুধী সমাজ ঘটনার রহস্য উদঘাটনের জন্য জোর দাবি জানিয়েছিলেন। এই পুরো ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে দেখা যায় যে, উক্ত মাওলানার সঙ্গে দুই বার নির্বাচিত জনৈক এক সাংসদের কন্যার পরকীয়া সম্পর্কের বিষয়টি আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ঘটনার পারিপার্শ্বিকতায় উক্ত নারীকে চিহিৃত করা হয় এবং গ্রেফতার করা হয়। উল্লেখ্য ঐ সাংসদ তৎকালীন সময়ে বংলাদেশ পুলিশে কর্মরত একজন শীর্ষ স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তার বন্ধু ছিলেন। এই বিষয়টি নিয়ে পরদিন বাংলাদেশের সকল জাতীয় পত্রিকায় উক্ত মাওলানা পরকীয়ার বলি হয়েছেন সংক্রান্তে খবর প্রকাশিত হয়। এই ঘটনার পর তৎকালীন চার দলীয় জোটের অন্যতম শরিক দল ইসলামী ঐক্য জোটের নেতা জনাব মুফতি মাওলানা ফজলুল হক আমিনী আমাকে ফোন করেন এবং আমাকে ১২ ঘন্টার মধ্যে বদলী করা হবে মর্মে হুমকি প্রদান করেন। কেবল তাই নয় তিনি আস্ফালন করে বলেছিলেন যে, আলেমদের বিতর্কিত করার চেষ্টার কারনে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করে বঙ্গোপসাগরে নিক্ষেপ করা হয়েছে। আর আপনার মত সামান্য এসি’কে এমন শিক্ষা দেওয়া হবে যে, ভবিষ্যতে আলেম সমাজের দিকে মাথা তুলে তাকানোর সাহস পাবেন না। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় এই যে, ঐ দিন বিকাল বেলায় আমাকে আমার কর্মস্থল থেকে অব্যাহতি দিয়ে বদলি করার পর মামলাটি সিআইডি’তে হস্তান্তর করা হয়েছিল। আমার বদলির বিষয়ে আমি কতটুকু কষ্ট পেয়েছিলাম তা অনুধাবন না করতে পারলেও একজন ব্যক্তি হত্যাকান্ডের শিকার হলেন এবং সেই হত্যাকান্ডের ঘটনা ধামা-চাপা দেবার চেষ্টা এবং ঘটনার মোড় অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেবার অপচেষ্টা আমাকে নিঃসন্দেহে মানসিকভাবে কষ্ট দিয়েছিল। দায়িত্ব হস্তান্তরের পূর্বে জিজ্ঞাসাবাদ থেকে যতটুকু জেনেছিলাম উক্ত নারীর ফুপাতো ভাইয়ের সাথে তার অল্প বয়সে বিয়ে হয়েছিল এবং তার স্বামী প্রবাসে কর্মের সন্ধানে চলে যায়। উক্ত নারী তার স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ফোন ফ্যাক্স এর দোকানে যাতায়াতের সুত্র ধরে উক্ত মাওলানার সাথে পরিচয় হয় এবং তার সাথে অনৈতিক সর্ম্পকে জড়িয়ে পড়ে। অনৈতিক এবং অনাকাঙ্ক্ষিত একটি সত্য ঘটনাকে ধামাচাপা দেওয়ার উদ্দেশ্যে তৎকালীন সরকারের ক্ষমতাশালীদের প্রভাবে আমাকে অন্যায়ভাবে বদলি করা হয়েছিল। উক্ত ঘটনায় অন্যায়ভাবে বদলীর স্বীকার হওয়ায় মনঃকষ্ট পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সম্মানিত আলেম সমাজের প্রতিনিধি হিসাবে একজন মাওলানার নারী ঘটিত অনৈতিক সম্পর্ক আমাকে চরমভাবে পীড়িত ও আহত করেছিল। ব্রিটিশ শাসন আমলে জন্মগ্রহণকারী ও ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত একজন বুজুর্গ মাওলানা আমার নানা এই বিষয়টি আমি সবসময় গর্বের সাথে স্মরণ করি এবং কোথাও কোনো সুযোগ পেলে আমার নানার কথা আমি প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করে থাকি। আলেম সমাজের একজন প্রতিনিধি মাওলানা মামুনুল হক আলেম উলামায়ে কেরাম তথা মাওলানা সমাজের মুখে কালিমালিপ্ত করে ইসলামের বিধান উপেক্ষা করে পরনারীতে বিধি বর্হিভূতভাবে আসক্ত যা অত্যন্ত গর্হিত ও নিন্দনীয় অপরাধ। এই ঘটনাগুলো অনভিপ্রেত, অনাকাঙ্ক্ষিত এবং হতাশাজনকও বটে। যাই হোক দীর্ঘদিন পর মনের ভেতর জমে থাকা এই ঘটনাটি ব্যক্ত করলাম এই কারনে যে, ইসলামের বেশ ধারন করে আলেম, উলামা, মাশায়েখদের মাঝে ঘাপটি মেরে থাকা নৈতিকতা বিবর্জিত ব্যক্তিদের অপকর্মের দায় অবশ্যই তাদের ব্যক্তিগত দায় হিসাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

অতিরিক্ত ডিআইজি

রংপুর বিভাগ

শাহ মিজান শাফিউর রহমান।